কবি'র জবানবন্দী

সর্বত্র একই আলোচনা- “কবিতার এখন দুর্দিন, কেউ কবিতা পড়ে না, পড়তে চায় না।” আমি এ মতের সাথে পুরোপুরি এক মত নই। কারণ কবিতা হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন শাখা, একই সাথে আকর্ষণীয়ও বটে। কবিতার এখন দূর্দিন বলার কারণ হচ্ছে বাজারে যে বিশাল পরিমাণ কবিতার বই আসছে তা পাঠক গলধঃকরণ করছে না। কেন যে মানুষ কবিতাকে গলধঃকরণ করছে না তা অনুসন্ধান না করেই “কবিতার দূর্দিন” কথাটি উচ্চারণ করা কতটা যুক্তিযুক্ত? প্রমথ চৌধুরী বলেছেন- “কাব্য জগতে যার নাম আনন্দ, তার নামই বেদনা”। বর্তমান সময়ের ক'জন কবি'র কবিতায় এ গুণটি পাওয়া যায়? এই গুণতো নেইই, উপরন্তু এমন সব শব্দ কবিতায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আবৃত্তি করলে মনে হয় যে, কবিতার নামে শব্দের মেঘ গর্জন, শীলা-বৃষ্টি, ইট- পাটকেল ছোঁড়া হচ্ছে শ্রোতার কর্ণকুহরে। এসব কবিতার অর্থ পাঠক খুঁজে পাওয়া তো দূরের কথা, কবি নিজে খুঁজে পান কি না, এই প্রশ্নের কোন উত্তরও কারো জানা নেই। এই যদি হয় কবিতার অবস্থা, তাহলে কেন পাঠক পয়সা খরচ করে এগুলো কিনবেন আর পাঠ করে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন। তবু কবিতার এই ক্লান্তিলগ্নে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের “আমার কৈফিয়ত” কবিতার একটি চরণ আমাকে তাড়া করে ফেরে- “অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যারা আছ সুখে।” আমার দ্বারা অমর কবিতা লেখা হবে এমনটি আমি বলতে পারি না। তবে আমি যে সুখে নেই এটি আমি নির্দ্বিধায় স্বীকার করি। তথাপি আমার কলম আমাকে সাহিত্যের প্রাচীন শাখা কবিতার দিগন্তরেখাহীন প্রান্তরে প্রতিনিয়ত টেনে নিয়ে যায়। ফলে কবিতার এই ক্লান্তিলগ্নে আমি কবিতা লেখার দুঃসাহস দেখাতে প্রয়াস পেয়েছি। আত্মকথার সমাপ্তিতে আমি আরবি সাহিত্যিক এজাজ আলী'র “নফহাতুল আরব” গ্রন্থটির ভূমিকার সামান্য অবতারণা করছি- “আমার এই গ্রন্থটি পাঠ করে কেউ যদি নিন্দা করে, আমি ধরে নেবো আমি তার যোগ্য। আর যদি প্রশংসা করে, ধরে নেবো আমার তা প্রাপ্য।" আশা করি গ্রন্থটি পাঠ করে অনুভূতি জানাতে কার্পন্য করবেন না।

মিলন-বিরহের সুর

 


পাড়ি দিতে হবে অনেকটা পথ

যেতে হবে দূর, আরও বহুদূর,

কাছে থেকে করতে আলিঙ্গন

পল্লীবালার মিলন-বিরহের সুর।

এলাম চলে লম্বা সফরে নওগাঁ’র কোলে,

পর মানুষ করতে আপন দূরত্ব ভুলে।

আপন মনে চলছি পথ, দেখছি পল্লীর রূপ,

কত জনার মুখে ফুটে উঠে হৃদয়ে জ্বলা ধূপ।

সারি সারি গাছের ফাঁকে পুকুর পাড়ে মাটির ঘরে,

ঘুমিয়ে পড়ে স্বজন নিয়ে সারা দিনের ক্লান্তি হরে।

ঢেঁকির মধ্যে পা ঠেকিয়ে ফুল কুমারী ভানে ধান,

কুলায় তুলে ঝাড়ে মাতা মুখে পুরে সুপারি-পান।

আপন মনে নক্সী কাঁথায় ফুল তুলে গাঁয়ের বঁধূ,

পাশে বসে ছোট কন্যা তার দুই নয়নে দেখে শুধু।

কচি মনে তার ভাবনা জাগে আগে যদি বড় হতাম,

শুঁইয়ের ফোঁড়ে কাঁথায় দুঃখ-ব্যথা সব আঁকিতাম ॥

১৫-২০ সেপ্টেম্বর ২০০৬ খ্রি., ভারশো, মান্দা, নওগাঁ।

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.