কবি'র জবানবন্দী

সর্বত্র একই আলোচনা- “কবিতার এখন দুর্দিন, কেউ কবিতা পড়ে না, পড়তে চায় না।” আমি এ মতের সাথে পুরোপুরি এক মত নই। কারণ কবিতা হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন শাখা, একই সাথে আকর্ষণীয়ও বটে। কবিতার এখন দূর্দিন বলার কারণ হচ্ছে বাজারে যে বিশাল পরিমাণ কবিতার বই আসছে তা পাঠক গলধঃকরণ করছে না। কেন যে মানুষ কবিতাকে গলধঃকরণ করছে না তা অনুসন্ধান না করেই “কবিতার দূর্দিন” কথাটি উচ্চারণ করা কতটা যুক্তিযুক্ত? প্রমথ চৌধুরী বলেছেন- “কাব্য জগতে যার নাম আনন্দ, তার নামই বেদনা”। বর্তমান সময়ের ক'জন কবি'র কবিতায় এ গুণটি পাওয়া যায়? এই গুণতো নেইই, উপরন্তু এমন সব শব্দ কবিতায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আবৃত্তি করলে মনে হয় যে, কবিতার নামে শব্দের মেঘ গর্জন, শীলা-বৃষ্টি, ইট- পাটকেল ছোঁড়া হচ্ছে শ্রোতার কর্ণকুহরে। এসব কবিতার অর্থ পাঠক খুঁজে পাওয়া তো দূরের কথা, কবি নিজে খুঁজে পান কি না, এই প্রশ্নের কোন উত্তরও কারো জানা নেই। এই যদি হয় কবিতার অবস্থা, তাহলে কেন পাঠক পয়সা খরচ করে এগুলো কিনবেন আর পাঠ করে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন। তবু কবিতার এই ক্লান্তিলগ্নে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের “আমার কৈফিয়ত” কবিতার একটি চরণ আমাকে তাড়া করে ফেরে- “অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যারা আছ সুখে।” আমার দ্বারা অমর কবিতা লেখা হবে এমনটি আমি বলতে পারি না। তবে আমি যে সুখে নেই এটি আমি নির্দ্বিধায় স্বীকার করি। তথাপি আমার কলম আমাকে সাহিত্যের প্রাচীন শাখা কবিতার দিগন্তরেখাহীন প্রান্তরে প্রতিনিয়ত টেনে নিয়ে যায়। ফলে কবিতার এই ক্লান্তিলগ্নে আমি কবিতা লেখার দুঃসাহস দেখাতে প্রয়াস পেয়েছি। আত্মকথার সমাপ্তিতে আমি আরবি সাহিত্যিক এজাজ আলী'র “নফহাতুল আরব” গ্রন্থটির ভূমিকার সামান্য অবতারণা করছি- “আমার এই গ্রন্থটি পাঠ করে কেউ যদি নিন্দা করে, আমি ধরে নেবো আমি তার যোগ্য। আর যদি প্রশংসা করে, ধরে নেবো আমার তা প্রাপ্য।" আশা করি গ্রন্থটি পাঠ করে অনুভূতি জানাতে কার্পন্য করবেন না।

পাগল- হাসান কবীর


নাহ্, দীর্ঘ দেড় ঘণ্টায় লোকটার মুখে কোন বুলি ফুটেনি। সে গাছের মত প্রাণী। নীরব, নিস্তব্ধ। প্রাণ আছে, আছে নাড়াচাড়াও। শুধু মুখে রা’ নেই। চোখে দৃষ্টিশক্তি আছে, আছে শ্রবণ শক্তিও। কিন্তু সেগুলোও গাছের মতই। গাছ যেমন সূর্যের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকে, তেমনি সেও প্রাশ্নকর্তাদের প্রশ্ন শুনে কারো কারো দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। সূর্য ডুবে গেলে রাতের বেলায় গাছ যেমন করে নিজের খেয়ালে মুখ ঘরিয়ে নেয়, সেও প্রশ্নের ঘোর কেটে গেলে আবার আপনার কাজে মন দেয়। 

এভাবেই দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা যাবৎ গাছের মত নীরব নিস্তব্ধ হয়ে ইট সিমেন্টের ঢালাই রাস্তার উপর একের পর এক আল্পনা এঁকে চলেছে। কিন্তু আল্পনা ও শিল্পীর চেহারায় আকাশ পাতাল ফারাক। শিল্পীর চেহারার সাথে এ আল্পনা যায় না। অঙ্কিত আল্পনার মানদণ্ডে এ শিল্পীর স্থান হওয়ার উচিৎ ছিল কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডীনের চেয়ারে। অঙ্কিত আল্পনাগুলো দেখলে চিত্র সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন এমন লোক মাত্রই বিষয়টি অনুধাবন করবেন।

আজ রবিবার। ভৈরব বাজারের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন। রমজান মাসের আজ দ্বিতীয় দিন। মাহবুব ভৈরব বাজারের উপকণ্ঠে “কিছুক্ষণ পাটোয়ারী কমপ্লেক্স” এ অবস্থিত বহুজাতিক কোম্পানী “ইউনিলিভার” এর স্থানীয় পরিবেশক সেন্টারে কম্পিউটার অপারেটরের চাকুরি নিয়েছে মাস ছয়েক হয়।

রমজান মাস। দুপুরে খাবারের ঝামেলা নেই। তাই উক্ত ভবনের দু’তলায় তার অফিস পার্শ্বস্থ মসজিদে যোহরের নামায আদায় করে একটু নিচে নেমেছে মুক্ত আকাশ দেখার জন্য। একটু মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবার জন্যে নিচে নেমে হাতের ডানদিকে চোখ পড়তেই লোকের জটলা দেখে এদিকে এগিয়ে এসেছিল মাহবুব। এসে দেখে এলাহী কাণ্ড। জীর্ণ শরীরে শীর্ণ পরিধেয় পড়া এক লোক। মাথায় উষ্কোখুষ্কো চুল। চেহারা ধুলো মলিন। চোখ দুটো যেন পাখির বাসা। কাজল বরণ গায়ের রং। কয়লা, ইটের গুঁড়া আর গাছের পাতা দিয়ে দক্ষ হাতে ইট-সিমেন্টের রাস্তার উপর এঁকে চলেছে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন ছবি। যেন এক নিপুণ সৌন্দর্যের কারিগর। যে আপনার হাতে গড়ে নিচ্ছে আপনার পৃথিবী। ছবির সাথে সাথে লিখছে মূল্যবান অনেক বাণী। যে সব বাণী ইতিপূর্বে কোথাও মাহবুবেরে চোখে পড়েনি।

কৌতূহলী মাহবুব এসব দেখতে দেখতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিয়েছে এখানে। দর্শক আরো বহুজন। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে এসব দেখছে। কেউ বা অল্প সময় দেখে এসব শিল্পকর্মকে পাগলের কাণ্ড আখ্যা দিয়ে উপহাসের হাসি হেসে চলে যাচ্ছে। কেউ বা এসব মোবাইলের ক্যামেরায় ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। কেউ কেউ এসব শিল্পকর্ম দেখে খুশি হয়ে শিল্পীর জন্যে দশ, বিশ টাকার নোট রেখে যাচ্ছে তার সামনে। করছে নানা জনে নানা মন্তব্যও। কোন কিছুর প্রতিই তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তার আপন মনে কাজ করে যাচ্ছে। যেন অবুঝ শিশু সাজিয়ে বসেছে খেলাঘর। তবে কেউ তাকে উদ্দেশ্য করে কোন প্রশ্ন করলে ইচ্ছে হলে প্রশ্নকর্তার প্রতি এক মায়াবী চাহনিতে তাকায়। আবার কাজে মন দেয়। কখনো তাকায়ও না। তবে মুখে কোন শব্দ উচ্চারণ করে না। কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ইচ্ছে হলে ঐ মূহুর্তে তার হাতে যা থাকে ইটের কণা বা কয়লার টুকরা দিয়ে মাটিতে লিখে উত্তর দেয়। 

মাহবুব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। শিল্প সংস্কৃতির প্রতি দারুণ আগ্রহী মানুষ। সে-ও ঐ পাগলের মত। পাগলের যেমন কারো প্রতি ভ্রুক্ষেপ নেই, আপন মনে কাজ করে চলেছে, মাহবুবেরও ঘড়ির প্রতি নজর নেই। সেও আপন মনে পাগলের কাণ্ড দেখে চলেছে। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে দেড় ঘণ্টা। পাগলের এখানে কতক্ষণ তা জানা নেই মাহবুবের। তবে লোকটি উপস্থিত জনতার কাছে পাগল হলেও মাহবুবের কাছে মোটেও পাগল নয়। তার কাছে সে বড় মাপের একজন চিত্রশিল্পী। যে কিনা জীবনে কোন বাকে ঘাত-প্রতিঘাতে হয়তো পাগলের বেশ ধারণ করেছে।

মাহুবুব মনে মনে ভাবে যে করেই হোক এ গুণী লোক পাগল হওয়ার পেছনের কাহিনী তাকে আবিষ্কার করতে হবে। যেভাবেই হোক। কিন্তু কীভাবে? এখনই তার অফিসের এস.আর.রা মার্কেট থেকে ফিরতে শুরু করবে। এ সময় বাইরে যাওয়া সমীচীন হবে না। আবার ভাবে, মাহবুবের শিল্পের প্রতি অনুরাগের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ জানেন, তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের মালিকও একটু আগে এ লোককে কিছু টাকা উপহার দিয়ে গেছেন লোকটির কাজে মুগ্ধ হয়ে। অতএব, এ বিষয়টি জানলে হয়তো একটু দেরি হলেও কর্তৃপক্ষ তাকে কিছু বলবেন না। এই ভরসায় সিদ্ধান্ত নেয় একটু দেরি হলে হোক, লোকটার রহস্য সে উদঘাটন করবে যেভাবেই হোক। এক লোকের প্রশ্নের উত্তরে লোকটি লিখেছিল, “আমি মূক নাই’’। এতে করে মাহবুব নিশ্চিত হয় যে, লোকটি কথা বলতে পারে। আর যেহেতু কথা বলতে পারে, সেহেতু রহস্য খুঁজে বের করা কঠিন কিছু হবে না।

মাহবুবের ভাবনার মধ্যেই লোকটি উপহার পাওয়ার টাকাগুলো গুছিয়ে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী তোরণের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। পেছনে মাটিতে শোভা পাচ্ছে তার মূল্যবান চিত্রকর্ম ও বাণী। বিয়ে বাড়ির কনে বিদায়ের পরের মূহুর্তে বাড়ি যেমন ফাঁকা হয়ে যায়, ঠিক তেমননি জটলা হওয়া লোকগুলোও যে যার কাজে চলে গিয়ে জায়গাটা ফাঁকা করে দিয়েছে। মাহবুব দ্রুত পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে চিত্রগুলোর কয়েকটা ছবি তুলে লোকটির পিছু নেয়। লোকটি সোহরাওয়ার্দী তোরণের নিচ দিয়ে গিয়ে রেল স্টেশনের পথ ধরেছে। মাহবুবও।

হাঁটতে হাঁটতে ভৈরব পৌর কবরস্থানের কাছে গিয়ে থামে লোকটি। মাহবুব তখনো লোকটি থেকে অনেকটা দূরে। লোকটি কবরস্থান সংলগ্ন মসজিদের চাপকল থেকে অজু সেরে গিয়ে মসজিদের বারান্দায় নামায পড়তে আরম্ভ করে। মাহবুব গিয়ে মসজিদের বারান্দায় এক পাশে বসে। লোকটি নামাযের পর মুনাজাত শেষ করে বের হতে উদ্যত হলে মাহবুব সালাম দেয়। লোকটি মাহবুবের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। ইশারায় সালামের উত্তর দিয়ে সামনে পা বাড়াতে উদ্যত হলে মাহবুব বলে- “একটু দাঁড়ান। আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।” মাহবুবের কথায় কোন কর্ণপাত না করেই সামনের দিকে পা বাড়ায় লোকটি। মাহবুবু দ্রুত গিয়ে লোকটির সামনে দাঁড়ায়। দু’হাত দু’দিকে প্রসারিত করে লোকটির গমন প্রতিরোধ করে বলে- যাবেন না প্লিজ। আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে। লোকটি গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে মাহবুবের দিকে তাকায়। ক্ষণেক মাহবুবকে দেখে নিয়ে পথ ছেড়ে দিতে ইশারা করে। মাহবুব পথ ছাড়ে না। লোকটির হাত ধরে বলে- “দেখুন, আমি জানি আপনার বাকশক্তি আছে। একটু আগে যে মজমায় আপনি চিত্র এঁকেছেন সেখানে আমি দীর্ঘ সময় ছিলাম। কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক আমি বিশ্বাস করি আপনি একজন বড় মাপের শিল্পী। সবাই আপনাকে পাগল মনে করলেও আমি আপনাকে একজন গুণী শিল্পীর আসনে দেখছি। আমি আপনার সাথে কিছু সময় কথা বলতে চাই। দয়া করে আপনি অমত করবেন না। নির্বাক থাকবেন না প্লিজ। আমাকে দয়া করে একটু সময় দিলে আমি অত্যন্ত প্রীত হবো। এখানটা নিরিবিলি আছে। ইচ্ছে করলে এখানেই বসতে পারেন। নতুবা চলুন সামনে চা দোকানে গিয়ে বসি।” 

মাহবুবের আচরণে মনে হয় লোকটি বিস্মিত হলো। ক্ষণিক তাকিয়ে রইলো মাহবুবের দু’চোখে চোখ রেখে। তারপর অত্যন্ত কোমল স্বরে বলল- “আমি রোজাদার। যা বলার এখানেই বলুন। তবে সময় বেশি না নিলে খুশি হবো। কী জানতে চান কোন উপমা বা ভূমিকা ছাড়াই বলুন।” লোকটির কথা বলা শুনে মাহবুবের কর্ণদ্বয় শীতল হলো। লোকটিকে নিয়ে মসজিদের বারান্দায় বসতে বসতে মাহবুব বলল- “আমিতো আপনার নাম জানি না। আপনাকে কী বলে সম্বোধন করবো?”

লোকটি বুঝতে পারলো মাহবুব তার নাম জানতে চাইছে। সেই সাথে সম্বোধন বাচক শব্দটি তার কাছ থেকেই আশা করছে। তাই লোকটি বলল- “আমার নাম আমানুল্লাহ। সারা দুনিয়ার মুসলমান একে অপরের ভাই। আপনার প্রশ্নের আগে আমার প্রতি আপনার কৌতূহলের কারণ ও আপনার পরিচয় জানতে চাই।”

মাহবুব চিত্রশিল্পী আমানুল্লাহকে নিজের নাম পরিচয় জানিয়ে তার প্রতি কৌতূহলী হবার কারণ বর্ণনা করলো অত্যন্ত সাবলীল ভাষায়। এরপর বললো- “আমানুল্লাহ ভাই, আপনার পরিচয়টা জানতে পারলে কৃতার্থ হই।”

মাহবুবের বয়স বিশ কি বাইশ হবে। আমানুল্লাহর চল্লিশের মতো। বয়সের দিক থেকে মোটামুটি অর্ধেকের মতো ব্যবধান দু’জনের। মাহবুব বয়সে অনেক ছোট হলেও তার প্রশ্ন শুনে আমানুল্লাহ বললো- “মাহবুব ভাই, অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন করলেন। বিগত প্রায় আট বছর ধরে এই কঠিন প্রশ্নটা হাজার হাজার বার শুনেছি। কিন্তু কাউকে উত্তর দেইনি। পরিচয় দেবার মতো ভালো একটা অবস্থান আমার ছিল। নিজে থেকে সেটা ছেড়ে এসেছি। আজ আমি পাগল। এটাই আমার পরিচয়। এর বাইরে বর্তমানে আমার আর কোন পরিচয় নেই। আমি পথের মানুষ। পথই আমার ঠিকানা। এর বাইরে বর্তমানে আমার আর কোন ঠিকানা নেই। আমি জানি আপনি আমার এ পরিচয় জানতে চাননি। জানতে চেয়েছেন আমার অতীত। কিন্তু কী হবে ওসব শুনে? অযথা দু’জনেরই সময় ব্যয় হবে।

আমানুল্লাহর কথা শুনে মাহবুব বললো- সে যাই হোক, আমি শুনবো। আপনি বলুন।

মাহবুবের সায় পেয়ে আমানুল্লাহ বলতে আরম্ভ করে- আমার বাড়ি উত্তর বঙ্গের নওগা জেলার মান্দা উপজেলার ভারশু গ্রামে। আমাদের খুব সুন্দর পরিপাটি একটি সুখী সংসার ছিল। সদস্য মাত্র তিনজন। মা, বাবা আর আমি। মাটির দেয়ালে বেষ্টিত বিশাল বাড়ি। পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর, এই তিন দিকের ভিটে তিনটি মাটির ঘর। বাড়ির বাইরে বিশাল পুকুর। পুকুরে পর বিশাল জায়গা জুড়ে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। পাড়া-প্রতিবেশি বন্ধুদের নিয়ে শৈশবের দিনগুলোর মধুর স্মৃতিগুলো আজো মনে রেখাপাত করে। ছুটির দিনে গোসলের সময় পুকুরে ডুব সাতারে মেতে উঠা, প্রতিদিন বিকেলে বড়শি দিয়ে পুকুরে মাছ ধরা, কানামাছি খেলা, সন্ধ্যের পর চাঁদের জোছনায় লুকোচুরি খেলা। আরো কত কী? এভাবে কত আনন্দেই না দিনগুলো কেটেছে। মাধ্যমিক পাশ করে চলে আসি ঢাকায়। ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হই। ভালো রেজাল্ট করি। গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এলেও আমি আমার গ্রামকে ভুলতে পারি না। ভুলতে পারি না মা-বাবা, পাড়া-প্রতিবেশি ও খেলার সাথী বন্ধুদেরকে। ভুলতে পারি না সোনালী ফসলের মাঠ, চৈতালী হাওয়ায় ধূলি উড়ানো মেঠোপথ। এগুলো যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। নিজের অজান্তেই কাগজের বুকে আঁকিবুঁকিতে জীবন্ত হয়ে উঠে আমার সেই ফেলে আসা শৈশব, কৈশোর আর সহজ সরল গ্রামীণ জীবনের বৈচিত্রময় ছবি। একদিন আমার কলেজের এক বড় ভাই ছাত্রাবাসে আমার কক্ষে প্রবেশ করে এমন একটি আঁকিবুঁকিপূর্ণ খাতা পেয়ে যান। খাতাটি দেখে তিনি আনন্দিত হন। যাবার বেলায় আমাকে একটি পরামর্শ দিয়ে যান। বলেন, তুমি চারুকলায় অনার্স করলে বেশ ভালো কিছু করতে পারবে। সেই কথানুসারে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হই। অনার্স মাস্টার্স শেষে রংপুরের কারমাইকেল কলেজে একটা চাকরিও জুটে যায়। কিন্তু ধরা বাঁধা নিয়মে আমার মন টেকে না। চাকুরি ছেড়ে দিলাম। মুক্তভাবে ছবি এঁকে বিক্রি করা শুরু করলাম। এক সময় বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকার কাজ পেতে থাকি। দেশের নামকরা অনেক লেখকের বইয়ের প্রচ্ছদও করেছি। এক সময় এসবের সব ছেড়ে দিয়েছি, ছাড়তে পারিনি শুধু আঁকাআঁকি। তবে এখন আর আগের মাঝে অনেক ফারাক। আগে আমার আঁকা ছবিকে লোকে বলতো শিল্পীর কারুকাজ। আর এখন বলে পাগলের কাণ্ড।

এ পর্যন্ত বলে আমানুল্লাহ উঠতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মাহবুব তাকে উঠতে দিল না। বললো- আমানুল্লাহ ভাই, আসল কথাইতো জানা হলো না আমার। এক্ষুনি উঠছেন কোথায়? বসুন। আপনার সাথে আমার কথাতো শেষ হয়নি। 

মাহবুবের কতা শুনে কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন চিত্রশিল্পী আমানুল্লাহ। যেন মাহবুবের কথার কিছুই বুঝেননি এমন একটা  ভাব নিয়ে মৃদু হেসে বললেন- আর কী কথা ভাই? আমার অতীত জীবনতো পুরোটাই বলে দিলাম। 

- না, পুরোটা বলেননি। আসল কথাটাই লুকিয়ে রেখেছেন আমার থেকে।

- আসল কথা! সেটা আবার কী?

- আপনার আজকের অবস্থানের কথা। এত সুন্দর পরিপাটি জীবন থেকে এই এলোমেলো জীবনে কীভাবে এলেন সেটা।

মাহবুবের মুখে এ কথা শুনে জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন চিত্রশিল্পী আমানুল্লাহ। মাহবুব অনুভব করলো এই দীর্ঘশ্বাসের সাথে যেন তার ভেতর থেকে হাজারো বছর ধরে জ্বলতে থাকা বেদনার অগ্নিগিরির লাভা বেরিয়ে এসেছে। এরপর তিনি বলতে আরম্ভ করলেন- সে এক করুণ ইতিহাস ভাই। মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর দিন দশেক আগে আমার বাবা মারা যান। পিতৃ বিয়োগের শোক বুকে নিয়েই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে যাই। বাবার শোকে মা প্রায় বিছানাশায়ী। এমতাবস্থায় নিকটাত্মীয়দের পরামর্শ মতো মা তার ভাতিজিকে আমার বউ করে আনেন। মায়ের ধারণা ছিল ভাতিজি ছেলের বউ হয়ে এলে অন্য মেয়ের তুলনায় আদর যত্ন একটু বেশি পাবেন কিন্তু ঘটলো উল্টো। দৃশ্যপট পাল্টে গেলো। দেখা গেলো অনাকাঙ্খিত চিত্র। যতই দিন গড়াতে লাগলো, ততই মায়ের কাছে মনে হতে লাগলো, তার ভাতিজি তাকে খাতির যত্ন করছে না। উপরন্তু তার ছেলেও বউয়ের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। মায়ের সেবা করে না। বউয়ের কানপড়ায় চলে। আর অপর দিকে বউয়ের কাছে মনে হতে লাগলো, সে শাশুড়ির সেবা করে করে মরে যাচ্ছে। কিন্তু শাশুড়ির মন ভরাতে পারছে না। আর স্বামী যেন তার মায়ের হাতপাখা। তিনি যেদিকে ঘুরান সেদিকেই ঘুরে। না ঘুরালে ঘুরে না। স্ত্রীর প্রতি কোন মনোযোগ নেই। আমি পড়েছি মহাবিপাকে। মায়ের কথা শুনে মনে হয় অযত্নে অবহেলায় মা ভাঙ্গা কুলার মতো হয়ে গেছেন। আর স্ত্রীর কথা শুনে মনে হয় সে পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মাকে বুঝাতে পারি না, স্ত্রীকেও। নিত্যদিন দু’জনের বাক-বিতণ্ডা লেগেই থাকে। বাড়িতে থাকলে যা অশান্তি, বাইরে গেলে তার চেয়েও বেশি অশান্তি। সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা কে কখন কোন অঘটন ঘটিয়ে বসে তার ঠিক নেই। বউ-শাশুড়ির যুদ্ধে আমি হচ্ছি বলির পাঠা। যুদ্ধ যখন তুঙ্গে তখন দু’জনের মাঝে শুরু হয় আমাকে কুক্ষিগত করে রাখার প্রতিযোগিতা। আমিতো মাকে ছাড়তো পারবো না। স্ত্রীকেও ফেলতে পারবো না। অথচ মা চাইছে বউকে ছাড়ি। আর স্ত্রী চাইছে মাকে দেই আড়ি। বিবেকবান মানুষ আমি এই অবুঝদের নিয়ে কী করতে পারি? মা বুঝে গেছেন স্ত্রীকে ছাড়ছি না। আর স্ত্রী বুঝে গেছে মাকে ফেলছি না। আমার জীবনের দু’জনেরই প্রয়োজন আছে এবং দু’জনকেই আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। তখন দু’জনেই বাঁকা পথে হাঁটতে থাকে। একদিন তাদের তুমুল বাকযুদ্ধের মাঝে আকস্মিক এসে উপস্থিত হয়ে শুনতে পাই- দু’জনেই একে অপরকে বলছে, আমিও খাব না, তোকেও খেতে দেবো না। পাগল করে বনে বনে ঘুরাবো।

পাগল! হুম, আমি পাগল হয়েছি। সেদিনের পর প্রায়ই লক্ষ্য করি একজন পুকুরের জলে জল মেশায়, তো অন্যজন খাবারের পানিতে জল মেশায়। একজন তেলে ফুক দেয়, তো অন্যজন হাতে তুড়ি বাজায়। একজন মোমের অনলে তাবিজ পুড়ায়, তো অন্যজন পুরাতন কবরে তাবিজ দাফন করে। এমন করতে করতে আমার অবস্থা এমন হলো যে, বাড়িতে ঢুকা মাত্রই অস্বস্তিবোধ হয়। কখনো মাথা ঝিমঝিম করে। কখনো মাথা ব্যথা হয়। কখনো চোখের সামনে এলোমেলো কত কিছু দেখি। এভাবে ক্রমেই স্বাস্থ্যহানি ঘটতে লাগলো আমার। সমাধানের কোন উপায় দেখলাম না চোখের সামনে। উপায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একদিনের তাদের দু’জনের ঝগড়ার কথা মনে পড়লো। তারা বলেছিল- “পাগল করে বনে বনে ঘুরাবো।” ভাবলাম, কথাটাতো মন্দ না। দারুণ হয় তো। ব্যাস, পাগলামি শুরু করে দিলাম। আমার পাগলামিতে তাদের কোনই আক্ষেপ হলো না। বরং দু’জনেই খুশি। আমিও খুশি মনে বেরিয়ে পড়লাম পথে। সেই থেকে পথই আমার ঠিকানা।

মাহবুব আমানুল্লাহর কথা শুনতে শুনতে তার কথার ঘোরে হারিয়ে যায়। ঘোর কাটতেই দেখে আমানুল্লাহ স্টেশনের ফ্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে। মাহবুব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ভাবে- আমান ভাই, বউ-শাশুড়ির যুদ্ধে বলির পাঠা হয়ে পাগল সেজে আপনি আপনার নামের মতোই আমান বা নিরাপদ হয়ে গেছেন। কিন্তু আরো কতো আমান না জানি পাগল না হতে পেরে জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছে।


# রচনাঃ সোমবার।। ১৫ জুন ২০২০।। রাতঃ ১১:৫০ মিনিট।। কালীপুর, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ।


কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.